এ কোন ইতিহাস রচনা করতে চান মোদি?

What history do you want Modi to write?

এ কোন ইতিহাস রচনা করতে চান মোদি?

ভোটের পালে জনমতের হাওয়া ধরে রাখার জন্য রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। বিশ্বজুড়ে এ এক নতুন হাওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে দিল্লিতে যা ঘটল তা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক দুটি কারণে।

প্রথমত, এটি একেবারে আমাদের ঘরের পাশে। দ্বিতীয়ত, ঘটনা পরম্পরা মধ্যযুগের ভারতবর্ষকে মনে করিয়ে দেয়। দেখা যাচ্ছে, মোদি সরকার সিএএ প্রশ্নে তাদের জন্য অসুবিধাজনক কোনো মন্তব্যই বরদাশত করতে পারছে না।

সিএএ-এর বিরোধিতাকারী যে কাউকে বিশেষত ছাত্রদের যে কোনো সামান্য ছুতোনাতা ধরে দেশদ্রোহী বানিয়ে দেয়া হচ্ছে। পাটিয়ালা কোর্টে জেএনইউ’র ছাত্রনেতা কানহাইয়ার জামিন আবেদনের আর্জির কাতরতার সুর এখনও মুছে যায়নি কান থেকে। সেই ক্ষত না শুকাতেই শুধু ফেসবুকে সিএএ নিয়ে প্রতিবাদের একটি ছবি প্রকাশের ‘অপরাধে’ বাংলাদেশি এক ছাত্রীকে দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের অর্থনীতি খাবি খাচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ দূরের কথা, পুরনো ঋণের চাপে অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান এখন আইসিইউ-এর রোগী। সেটি ঢাকতেই একের পর এক এ গৌড়ীয় মিশন। সমস্যা হল এ ‘গৌড়ীয় মিশন’-এর ঘটনাস্থল দিল্লি। উৎকণ্ঠার মাত্রাও তাই বেশি। কেননা এ রাজ্যটি সম্পূর্ণ নগরায়িত (উৎপাদমুখী নয়), যেখানে কংগ্রেসের শক্তি প্রায় বিলুপ্ত, অভিবাসীতে বোঝাই এবং এটি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল একটি রাজ্য। এখানে কৃষি বা শিল্প থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব পর্যাপ্ত নয় এবং রাজ্যের ব্যয়ভার চালানোর জন্য সারা বছর কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। পাশের অধিকাংশ জেলা জাঠগোষ্ঠী অধিভুক্ত, বিজেপি সমর্থনপুষ্ট। বিপরীতে কেজরিওয়ালের সম্বল কেবল জনমোহিনী গিমিক আর পপুলিস্ট ইমেজ। দিল্লির দাঙ্গার খোঁজখবর যারা রাখছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন সেখানে দুর্গত মুসলমানদের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আশ্রয় দিচ্ছেন, দুর্গত হিন্দুদের মুসলিমরা। একটি মুসলিম পরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে প্রেমকানথ নামের একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। চরম বিপর্যয়ের মুখে এ দুই ধর্মাবলম্বী যে একে অন্যের অবলম্বন হয়ে উঠছে তা আমরা পত্রিকায় পড়ছি।

প্রশ্ন উঠতে পারে হামলাকারীদের জাতধর্ম নিয়েও। সমস্যা সেখানেই। এরা সবাই এসেছে রাজধানী লাগোয়া উত্তর প্রদেশের জেলা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হামলার নির্দেশ পেয়ে। শুরুতে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা বলেছিলাম সেটি এ কারণেই যে, কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি সরকার যারা সংঘ পরিবারের হিন্দুত্ববাদী বাহিনীকে সংযত রাখতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। এ অন্ধ শক্তি মনে করে কংগ্রেস আমলে ভারতের আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল।

গেরুয়া হল সূর্যোদয়ের রং এবং এ রং দিয়েই ভারতে নতুন সূর্যের উদয় হবে। কপিল সিব্বল বলেছেন বিপরীত। মোদি কতবার মন্দিরে যান? তিনি আসল হিন্দু নন, নকল হিন্দু। আসল হিন্দু কিংবা নকল হিন্দু যেটাই হোন, দুশ্চিন্তার বিষয় মোদি সরকারের উন্নয়নের দামামার অন্তরালে এমন একটি আগ্রাসী সাংস্কৃতিক নীতি রয়েছে যার গোপন এজেন্ডা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা।

সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারার বিলোপ সংঘ পরিবারের স্বপ্ন বাস্তবায়নের আরেক প্রক্রিয়া। সব দেখে মনে হচ্ছে, রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ভারত। এ কি মোদি প্রতিশ্রুত সেই ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর ‘আচ্ছেদিন’? ইতিহাসের শিক্ষার্থীরা জানেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীও রাম রাজ্যের কথা বলেছেন; কিন্তু কোন রাম? ‘রামধনু’ ছিল মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় সঙ্গীত, শৈশব থেকে রাম চরিত্রটি তার প্রিয় সাহিত্য চরিত্র।

গান্ধীজির রাম বলতে পারেন ‘যদি স্নেছোরা আমার মন্দিরে ঢুকে আমাকে অপবিত্র করে, তাতে হিন্দুর কী? হিন্দু আমাকে রক্ষা করে নাকি আমি হিন্দুকে রক্ষা করি?’ রামকে কে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন সেটিও ভাবার বিষয়। অম্বেদকার, সাভারকার, গান্ধীজি আর মোদির রাম এক নয়। গান্ধীজির রামরাজ্যে দলিতের মন্দিরে প্রবেশ নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ থাকে না, মুসলিম সেখানে অচ্ছুৎ বিবেচিত হয় না। আর সাভারকারের দর্শনে বিশ্বাসী মোদির ভারতে অ-হিন্দুদের বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। গান্ধীজি ঘোষণা দিয়ে বলতে পারেন তিনি একইসঙ্গে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি সব। আর মোদির হিন্দুত্ববাদী বাহিনী মনে করে ‘নঃ হিন্দু পতিত ভবেৎ’। হিন্দু কখনও পতিত হতে পারে না, অন্যায় করতে পারে না।

যে আরএসএসের দর্শনে এখনকার ভারত পরিচালিত হচ্ছে তার সর্বময় নেতা সরস সংঘচালক এমএস গোলওয়ালকর মনে করেন রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার পথে তিন বাধা- মুসলিম, খ্রিস্টান ও কমিউনিস্ট। মহাত্মা গান্ধী মহাভারতকে দেখতেন ধর্মশাস্ত্র হিসেবে। মোদিজি দেখেন ইতিহাস হিসেবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) মনে করে মহাভারত ইতিহাস এবং সেই ইতিহাস অনুযায়ী পরিচালিত হবে ভারত। মুশকিল এই যে, মোদির প্রতি আকর্ষণ-বিকর্ষণ প্রীতিবিদ্বেষ যাই থাকুক না কেন, তাকে উপেক্ষা করতে পারছে না কোনো রাজ্য সরকারই।

এ অবস্থায় কেজরিওয়াল কীভাবে দিল্লি সংকট মোকাবেলা করবেন সেটি গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয়। এনআরসি ও সিএএ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে পিংক ফ্লয়েড। এনসিএ ও সিএএ নিয়ে আন্দোলনরত তথাকথিত এনার্কিস্ট মুসলিমদের সঙ্গে সংহতি জানানোর মতো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কমতি নেই ভারতেও। তবে শুভবোধসম্পন্ন মানুষ যতই থাকুক, রাষ্ট্রনীতির কাছে শুভবোধও অনেক সময় অসহায় হয়ে দাঁড়ায়। ক্রমাগত হিন্দুইজমের কাছে ভারতীয় সংস্কৃতিকে পরাজিত হতে দেখে সেটাই মনে হয়। গত কয়েক বছরের ঘটনা পরম্পরা অহিংস নয়, সহিংস ভারতের ভাবমূর্তি সামনে নিয়ে আসে। একই ভাষা বাংলা। এ ভাষায় রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন, বঙ্কিমও লিখেছেন। যে ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে রবীন্দ্রনাথ তাকে বলেছেন ধর্মমোহ আর বঙ্কিম চন্দ্র লিখেছেন ‘কিছুই ধর্ম্ম ছাড়া নহে। ধর্ম্ম যদি যথার্থ সুখের উপায় হয় তবে মনুষ্য জীবনের সর্বাংশই ধর্ম কর্তৃক শাসিত হওয়া উচিত। ইহাই হিন্দু ধর্মের প্রকৃত মর্ম।’

‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’য় নেহরু তত্ত্ব দিয়েছিলেন, আলেকজান্ডারের আক্রমণের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ হিসেবে হিন্দুত্ববাদের উত্থান। প্রশ্ন হল এখন তো আর কোনো বহিরাগত নেই। এখন কেন হিন্দুইজমের জাতীয়তাবাদ? ব্রিটিশশাসিত ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য না হয় ব্রিটিশের ভেদনীতিকে দায়ী করা যায়; কিন্তু স্বাধীন ভারতে এ যুক্তি তো হালে পানি পায় না।

এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘হিন্দু ও মুসলমানকে যে পরস্পরের বিরুদ্ধে লাগানো যায় এটাই ভেবে দেখার বিষয়। কে লাগাল সেটা গুরুতর বিষয় নয়। শনি তো ছিদ্র না পেলে প্রবেশ করতে পারে না অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্পর্কেই সাবধান হতে হবে।

হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে থাকলে পরস্পরের কত সুবিধা এ ভেবে যদি তারা একসঙ্গে থাকতে চায় তাহলে সেটি প্রাণ থেকে থাকা নয়। আমরা মানুষ। আমরা যদি সুখের মতো দুঃখের সময়েও একসঙ্গে থাকতে না পারি তবে সেটি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের জন্য লজ্জার।’

রবীন্দ্রনাথের মতো এত গভীর ও মহৎভাবে ভাবার ক্ষমতা আমাদের নেই; কিন্তু সামান্য দৃষ্টি দিয়েও দেখতে পাচ্ছি, বহুত্ববাদিতাকে উপেক্ষা ও ধ্বংস করে যখন কোনো দেশ তাদের সমাজ ও জাতি পরিচয়কে একমাত্রিক করে তুলতে চায় তার পরিণতি কত বিপজ্জনক অভিমুখ তৈরি করতে পারে।

দিল্লির দিকে তাকিয়ে তা পরিষ্কার বোঝা যায়। আরও বুঝতে পারি ইতিহাস যদি নিজের জোরে কাল জয় করতে না পারে তবে তা কেবল ওপর থেকে আরোপ করলেই টিকিয়ে রাখা যায় না। এনসিএ ও সিএএ উপর থেকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া, আরোপ করা বিষয় বলেই তা নিয়ে এত সংঘাত-সংঘর্ষ, প্রাণক্ষয়। তবে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলেই এটি টিকবে না। দুঃখ শুধু মোদি সরকারের এ বোধোদয়ের আগে না জানি আরও কত মূল্যবান প্রাণ ঝরে যায়!

জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক